Wednesday, January 24, 2018
Home > বিশেষ প্রতিবেদন > নবান্নের অন্দরের খবর জানতে চান মুকুল!

নবান্নের অন্দরের খবর জানতে চান মুকুল!

গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়:(প্রবীন সাংবাদিক) শনিবার ঠিক রাত বারোটায় শনি দেবতার সামনে নতজানু হয়ে বসতেন পশ্চিম জঙ্গলমহলের সর্বময় কত্রী। তিনি তো তখন শুধূ পুলিশ সুপার নন, দুর্মূখেরা বলে, তখন তিনি হাতে মাথা কাটার অধিকারিনী ভারতী ঘোষ। মোড়ে মোড়ে দেড়শো সেপাই-সান্ত্রী মোতায়েন হয়ে যেত। যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ হয়ে যেত। রাস্তাঘাট শুনশান। শনিপুজো শেষ হলে ফের প্রাণ ফিরে পেত শহর। আমজনতা হাঁফ ছেড়ে বাঁচত, শুধু মনে মনে গজরাতেন ছাপোষা সাংবাদিকরা। কারণ, ভারতী ঘোষের খবর ভারতী ঘোষের বিনানুমতিতে প্রকাশ করার ক্ষমতা কারোরই ছিল না। এক তরুণ সাংবাদিক দীর্ঘশ্বাস চেপে জানালেন, সমস্ত থানার কাছে অলিখিত নির্দেশ ছিল, পুলিশ সুপারের শিলমোহর না পড়লে জেলার কোনও ঘটনা যেন সাংবাদিকদের কাছে না যায়। শনিদেব রুষ্ট হওয়ার চেয়ে ভারতী দেবী যাতে রুষ্ট না হন সেদিকে নজর রাখাই ছিল পুলিশের মূল কাজ।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত শনি দেবতা ভারতী দেবীকে বাঁচালেন না। এই সেদিন পর্যন্ত যিনি ছিলেন জঙ্গলমহলের সর্বেসর্বা তাঁর এহেন দশায় যে প্রশ্ন সামনে আসছে, তার মধ্যে সর্বার্গগণ্য: প্রাক্তন পুলিশ সুপারের জীবনে রাত বারোটা কি নতুন বর্ষের ঘণ্টাধ্বনি বয়ে নিয়ে আসছে, নাকি নবান্নের নির্দেশে তাঁর পেশারই বারোটা বাজতে চলেছে? এ রাজ্যের রাজনীতিতে এই বাক্যবন্ধটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, বিশেষ করে মুকুল-সবং-ভারতীর ত্র্যাহস্পর্শ দোষ কাটাতে মুখ্যমন্ত্রী তৎপর হয়ে ওঠার পর।
এই প্রশ্ন ছাড়া আরও কিছু সংশয় রাজনৈতিক পরিবেশে মুকুলিত হচ্ছে; তার মধ্যে প্রধান, সবং উপনির্বাচনে বিজেপির ভোটবাক্স বেশ খানিকটা ভারি হয়ে যাওয়া; নির্বাচনের আগে সবং বিধানসভা কেন্দ্রে দলছুট তৃণমূলী এবং বিজেপির সাইডলাইনে বসে থাকা মুকুল রায়ের অবাধ বিচরণ এবং বেশ কয়েকমাস ধরে প্রগাঢ় রাজনৈতিক জ্ঞানের প্রতি ভারতী ঘোষের প্রবল আগ্রহ। পুলিশেরা কানাঘুষো করছেন, রাজনীতি সংক্রান্ত মোটা মোটা কেতাব পড়ে ফেলছেন ভারতী।
সবংয়ের ফলাফলের সঙ্গে মুকুলের মাটি কামড়ে বসে থাকার মধ্যে কার্য-কারণ সম্পর্ক আছে কিনা হিসেবনিকেশ করতে হলে ভারতী ঘোষের ভূমিকার পর্যালোচনাও এসে পড়বে। কারণ (ক) জেলার নাড়িনক্ষত্র যেখানে ভারতীর নখদর্পণে সেখানে বিজেপির বাড়বাড়ন্তের খবর বা মুকুলের পরিকল্পনার পুঙ্খানুপুঙ্খ খবর সরকারের কাছে আগে থেকে ছিল না,(খ) পরণে খাকি উর্দি থাকলেও অন্তরে-বাহিরে ভারতী ছিলেন ব্র্যান্ডেড তৃণমূলী কিন্তু অধিকাংশ স্থানীয় নেতা-নেত্রীর সঙ্গে তাঁর আদায়-কাঁচকলায় সম্পর্ক হয়ে পড়ছিল এবং(গ) জেলাস্তরের তৃণমূল নেতা-নেত্রীদের তিনি সিকি-আধুলি সমান জ্ঞান করায় দলের মধ্যে সমান্তরাল সংগঠন তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। মুকুল রায়ের তো এরকমই এক সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক দক্ষতাসম্পন্ন পুলিশ অফিসারের প্রয়োজন ছিল। দলের সঙ্গে বিচ্যুতির আগে ভারতীর সঙ্গে মুকুল রায়ের রাজনৈতিক সম্পর্ক যে মধুর ছিল তা বোধকরি জেলার দুধ দাঁত ওঠা শিশুদের কাছেও অজ্ঞাত নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিভিন্ন জেলায় দলীয় খবরের জন্য একসময় পুলিশ এবং আমলাদের উপর ভরসা করেছিলেন। কিন্তু যেহেতু তিনি নিজেও জেলার প্রতিটি কর্মীকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন, সবংয়ের নির্বাচনী ফলাফলের কাঁটাছেড়া করা তাঁর কাছে সহজ হয়েছে। সেখানে যূপকাষ্ঠে প্রথম মাথাটি ঢুকেছে ভারতী ঘোষের, তাতে আপাতত পরোক্ষে লাভ হয়েছে মুকুল রায়ের কারণ জনমানসে একটি বার্তা গিয়েছে যে মুকুলের তৎপরতায় ভারতী ঘোষ আর আগমার্কা তৃণমূলি নেই।
ভারতী ঘোষ পদত্যাগ করায় তার আঁচ রাজনৈতিক মহলে পড়া খুবই স্বাভাবিক, কারণ এই পদত্যাগ যথেষ্ট ইঙ্গিতপূর্ণ। তিনি এবার যদি রাজনীতির প্রাঙ্গণে নেমে পড়েন তাহলে আশ্চর্যের কিছু থাকবে না। আর তাঁকে বিজেপিতে নিয়ে আসতে পারলে মুকুল রায়ের সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় মিলবে। বিজেপিতে মুকুলের দর এবং ওজন বাড়বে। তৃণমূলে বিভিন্ন অসন্তোষের মধ্যে এরকম ফাঁকফোকরই তো খুঁজে বেড়াচ্ছেন মুকুল রায়।যেমন পুরুলিয়ায় স্কুলকর্মী গ্রেফতার হওয়ার পর কূর্মী সম্প্রদায়ের মধ্যে অসন্তোষের ফলে লাভ তুলতে চেষ্টার ত্রুটি রাখেননি মুকুল রায়।
পুরুলিয়া জেলায় মাহাত গোষ্ঠী বা কূর্মী সম্প্রদায়ের ভোটব্যাঙ্ক যথেষ্ট মজবুত। পুরুলিয়ায় মুকুলের সভায় মাহাত সম্প্রদায়ের লোকজনই ভিড় বাড়িয়েছে। মুকুল স্বভাবতই চাইছেন সেখানে যাতে এই অসন্তোষ বজায় থাকে।
ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে লর্ড পামারস্টোন বলেছিলেন, কোনও দেশই অপর দেশের চিরন্তন বন্ধু হয় না, একটি দেশের সঙ্গে অন্য দেশের স্বার্থচিন্তাই সবার আগে থাকে। এই একই কথা যে কোনও রাজনীতির ক্ষেত্রেও একইভাবে খাটে। সেটা মুকুল রায় ভাল করে জানেন বলেই বিভিন্ন গোষ্ঠী আর ব্যক্তিত্বের মাঝে স্বার্থের সন্ধান করে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু তিনি এটাও জানেন, সবংয়ের পর তাঁর প্রধান প্রতিপক্ষ স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী, যিনি আপাদমস্তিষ্ক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর সঙ্গে লড়াইয়ে নামতে হলে একে-একে দুই না হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। পুরুলিয়ায় স্কুল শিক্ষক গ্রেফতার হওয়ার পর সরকার বিরোধী যে হাওয়া উঠেছিল তা আজ স্তিমিত কারণ মুকুল রায়ের আমলেই টেট অনুত্তীর্ণ প্রার্থী শিক্ষক পদে নিযুক্ত হওয়ার কারণে গ্রেফতার হওয়ায় পুরুলিয়ায় মুকুল বিরোধী হাওয়াও উঠতে শুরু করেছে। অন্যদিকে সবংয়ের পর ভারতী ঘোষ পদত্যাগ করলেও নবান্ন তাঁকে নিয়ে কী ভাবছে তার বিন্দুবিসর্গ আর জানতে পারছেন না মুকুল।
এবার, অনেক সতর্ক হয়ে হাঁটার সময় এসে গিয়েছে মুকুল রায়ের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *